News & Articles
You will get the latest news about Astronomy
HOME / ARTICLES / বোর্টল স্কেল ও আলো দূষণ : রাতের আকাশ বোঝার সহজ উপা...
January 16, 2026 68 views
Browse by: Observation Tools

বোর্টল স্কেল ও আলো দূষণ : রাতের আকাশ বোঝার সহজ উপায় । Bortle Scale and Light Pollution: An Easy Way to Understand the Night Sky

বোর্টল স্কেল ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান !

রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে “আকাশ কতটা অন্ধকার” এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। আপনি খালি চোখে কতটি তারা দেখতে পাচ্ছেন, মিল্কিওয়ে কতটা স্পষ্ট, কিংবা দূরবর্তী গ্যালাক্সি দেখা সম্ভব কি না—সবকিছুই নির্ভর করে আপনার আকাশের অন্ধকারের মাত্রার ওপর।


এই অন্ধকারের মান নির্ধারণ করতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন বোর্টল স্কেল (Bortle Scale), যা আকাশকে ৯টি শ্রেণিতে ভাগ করে। আজও বোর্টল স্কেল পেশাদার ও শৌখিন উভয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে জনপ্রিয়। যদিও এখন SQM (Sky Quality Meter)-এর মতো যন্ত্র দিয়ে আলো পরিমাপ করা হয়, তবুও মাঠপর্যায়ে দ্রুত মূল্যায়নের জন্য বোর্টল স্কেলই সবচেয়ে সহজ ও ব্যবহারিক পদ্ধতি।

বোর্টল স্কেল কী? 

রাতের আকাশে তারা দেখার অভিজ্ঞতা সবার জন্য একরকম নয়। কোথাও দাঁড়িয়ে হাজারো তারা দেখা যায়, আবার কোথাও কয়েকটি উজ্জ্বল তারা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো আলো দূষণ (Light Pollution)।

রাতের আকাশ কতটা অন্ধকার বা আলো-দূষিত, সেটি পরিমাপ করার জন্য যে মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, সেটিই বোর্টল স্কেল (Bortle Scale)।

কে এবং কেন বোর্টল স্কেল তৈরি করেন?

১৯৯০-এর দশকে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন ই. বোর্টল (John E. Bortle) এই স্কেলটি প্রস্তাব করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সহজ পদ্ধতি তৈরি করা, যাতে একজন সাধারণ স্টারগেজারও বুঝতে পারেন তার পর্যবেক্ষণ স্থলের আকাশ আসলে কতটা ভালো বা খারাপ। এর আগে আলো দূষণ বোঝাতে জটিল পরিমাপ বা বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হতো। বোর্টল স্কেল সেই জটিলতা দূর করে একটি সহজ ভাষার মানচিত্র তৈরি করে দেয়। এই স্কেল জ্যোতির্বিদ, স্টারগেজার ও টেলিস্কোপ ব্যবহারকারীদের জন্য একটি বাস্তবধর্মী নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।

বোর্টল স্কেল কীভাবে কাজ করে?

এই স্কেলে আকাশকে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত মোট ৯টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে— ক্লাস 1 মানে প্রায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, অক্ষত অন্ধকার আকাশ এবং ক্লাস 9 মানে চরম আলো-দূষিত অভ্যন্তরীণ শহরের আকাশ

প্রতিটি শ্রেণিতে বর্ণনা করা হয়—

  • খালি চোখে কতটা ক্ষীণ তারা দেখা যায়
  • মিল্কিওয়ে দৃশ্যমান কি না
  • রাশিচক্রের আলো বা এয়ারগ্লো বোঝা যায় কি না
  • টেলিস্কোপে গভীর-আকাশের বস্তু কতটা স্পষ্ট হয় এই লক্ষণগুলো মিলিয়ে যে কেউ নিজের আকাশের শ্রেণি আন্দাজ করতে পারে।
কেন বোর্টল স্কেল গুরুত্বপূর্ণ?

বোর্টল স্কেল শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি আপনাকে বাস্তবভাবে জানিয়ে দেয়—

  • আপনি খালি চোখে কতটি তারা দেখতে পারবেন
  • মিল্কিওয়ে দেখা যাবে কি না•কোন গভীর-আকাশের বস্তু (গ্যালাক্সি, নীহারিকা, ক্লাস্টার) দেখা সম্ভব
  • টেলিস্কোপ বা দূরবীনের সক্ষমতা কতটা কাজে লাগবে যারা নতুন জ্যোতির্বিদ্যা শেখা শুরু করছেন, তাদের জন্য বোর্টল স্কেল প্রত্যাশা নির্ধারণে খুবই সহায়ক।

বোর্টল স্কেল জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে—

  • পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা: কোন বস্তু দেখা সম্ভব, কোনটি নয় তা আগে থেকেই জানা যায়
  • টেলিস্কোপ নির্বাচন: আকাশ অনুযায়ী যন্ত্রের সক্ষমতা বোঝা যায়
  • স্থান তুলনা: দুই জায়গার আকাশের মান সহজে তুলনা করা যায়
  • আলো দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা: নিজের এলাকার আকাশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, তা বোঝা যায়

নিচে প্রতিটি শ্রেণি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো, যাতে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন আপনার আকাশ কোন স্তরে পড়ে এবং সেখানে কী কী দেখা সম্ভব।

বোর্টল স্কেল অনুযায়ী রাতের আকাশের শ্রেণিবিভাগ

Find the Best Dark Sky Locations for Stargazing

Click The Below Link

Light Pollution Map

ক্লাস 1: চমৎকার অন্ধকার-আকাশের সাইট

এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত অন্ধকার আকাশের শ্রেণি। এখানে খালি চোখে সীমাবদ্ধ মাত্রা প্রায় 7.6 থেকে 8.0, বিশেষ চেষ্টা করলে আরও ক্ষীণ তারা দেখা যায়। বৃহস্পতি বা শুক্র আকাশে থাকলে সামান্য অন্ধকার অভিযোজন কমে যেতে পারে।

রাশিচক্রের আলো, Gegenschein, এবং পুরো রাশিচক্র পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। গ্যালাক্সি M33 সরাসরি দৃষ্টিতেই খালি চোখে দেখা যায়। মিল্কিওয়ের বৃশ্চিক ও ধনু অঞ্চল মাটিতে স্পষ্ট ছায়া ফেলে, যা এই আকাশের অন্ধকারের প্রমাণ।

দিগন্তের প্রায় ১৫° পর্যন্ত এয়ারগ্লো একটি ক্ষীণ প্রাকৃতিক আভা হিসেবে সহজেই বোঝা যায়। ৩২-সেমি (১২½-ইঞ্চি) টেলিস্কোপে প্রায় 17.5 মাত্রার নক্ষত্র শনাক্ত করা যায় এবং ৫০-সেমি যন্ত্রে তা ১৯তম মাত্রা পর্যন্ত পৌঁছে।

গাছঘেরা ঘাসে ঢাকা মাঠে পর্যবেক্ষণ করলে আপনার টেলিস্কোপ, সঙ্গী এমনকি গাড়িও প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এটিই প্রকৃত “জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নির্বাণ”।

ক্লাস 2: আদর্শ সত্যিকারের অন্ধকার সাইট

এখানে দিগন্ত বরাবর এয়ারগ্লো দুর্বলভাবে দৃশ্যমান হতে পারে। M33 সহজেই সরাসরি দৃষ্টিতে দেখা যায়। গ্রীষ্মের মিল্কিওয়ে অত্যন্ত সুগঠিত এবং দূরবীনে এর উজ্জ্বল অংশগুলো শিরাযুক্ত মার্বেলের মতো মনে হয়।

রাশিচক্রের আলো ভোরের আগে ও সন্ধ্যার পরে যথেষ্ট উজ্জ্বল হয়ে হালকা ছায়া ফেলে এবং মিল্কিওয়ের নীল-সাদা আভাসের তুলনায় এর হলুদ রঙ বোঝা যায়। আকাশের মেঘগুলো তারার পটভূমিতে অন্ধকার গর্তের মতো দেখা যায়। অনেক মেসিয়ার গ্লোবুলার ক্লাস্টার খালি চোখেই দৃশ্যমান। খালি চোখের সীমা প্রায় 7.1–7.5, আর ৩২-সেমি টেলিস্কোপে 16–17 মাত্রা পর্যন্ত তারা দেখা যায়।

ক্লাস 3: গ্রামীণ আকাশ

দিগন্ত বরাবর আলো দূষণের কিছু ইঙ্গিত দেখা যায়। মেঘগুলো দিগন্তের কাছে হালকা আলোকিত হলেও মাথার উপরে অন্ধকার থাকে। মিল্কিওয়ে এখনও জটিল ও সমৃদ্ধ দেখায়।

M4, M5, M15, M22-এর মতো গ্লোবুলার ক্লাস্টার খালি চোখে দেখা যায়। M33 এভার্টেড ভিশনে সহজেই ধরা পড়ে। বসন্ত ও শরতে রাশিচক্রের আলো দিগন্তের ৬০° পর্যন্ত উঠে আসে এবং এর রঙ দুর্বলভাবে বোঝা যায়। খালি চোখের সীমা 6.6–7.0, আর ৩২-সেমি প্রতিফলক টেলিস্কোপে ১৬তম মাত্রা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব।

ক্লাস 4: গ্রামীণ/উপনগর উত্তরণ

এই আকাশ অনেকের কাছে “ভালো আকাশ” হিসেবে পরিচিত। শীতকালীন নক্ষত্রপুঞ্জ পরিষ্কার দেখা যায়, তবে মিল্কিওয়ে নাটকীয় নয়। বিভিন্ন দিকে শহরের আলো-দূষণ গম্বুজ স্পষ্ট থাকে।

রাশিচক্রের আলো দেখা যায়, তবে গোধূলির গভীর অংশে পৌঁছায় না। মিল্কিওয়ে এখনও চোখে পড়ে, কিন্তু সূক্ষ্ম কাঠামো হারিয়ে যায়। M33 শুধুমাত্র এভার্টেড ভিশনে এবং ৫০°-এর বেশি উচ্চতায় দেখা সম্ভব। খালি চোখের সীমা 6.1–6.5, আর ৩২-সেমি টেলিস্কোপে প্রায় 15.5 মাত্রা পর্যন্ত তারা দেখা যায়।

ক্লাস 5: শহরতলির আকাশ

এখানে রাশিচক্রের আলোর ইঙ্গিত কেবল ভালো বসন্ত ও শরতের রাতে দেখা যায়। মিল্কিওয়ে দিগন্তে প্রায় অদৃশ্য এবং মাথার উপরে ধুয়ে যাওয়া অনুভূত হয়। মেঘগুলো আকাশের তুলনায় স্পষ্টভাবে উজ্জ্বল দেখা যায়। খালি চোখে সীমা 5.6–6.0, আর ৩২-সেমি প্রতিফলক টেলিস্কোপে 14.5–15 মাত্রা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়।

ক্লাস 6: উজ্জ্বল শহরতলির আকাশ

রাশিচক্রের আলোর কোনো চিহ্ন নেই। মিল্কিওয়ের সামান্য আভাস কেবল জেনিথের কাছে পাওয়া যায়। দিগন্তের ৩৫°-এর মধ্যে আকাশ ধূসর-সাদা হয়ে থাকে। M33 খালি চোখে অসম্ভব এবং M31 কেবল কষ্টে বোঝা যায়। খালি চোখের সীমা প্রায় 5.5, আর টেলিস্কোপে 14.0–14.5 মাত্রা।

ক্লাস 7: শহরতলির/শহুরে রূপান্তর

আকাশের পটভূমি ধূসর-সাদা। শক্তিশালী আলো সব দিকেই দৃশ্যমান। মিল্কিওয়ে কার্যত অদৃশ্য।M44 বা M31 খুব অস্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে। উজ্জ্বল মেসিয়ার বস্তুগুলোও বড় টেলিস্কোপে ফ্যাকাশে দেখায়। খালি চোখের সীমা প্রায় 5.0, আর টেলিস্কোপে ১৪তম মাত্রা।

ক্লাস 8: শহরের আকাশ

আকাশ কমলা বা সাদা-ধূসর। আপনি অনায়াসে খবরের কাগজের শিরোনাম পড়তে পারেন। কিছু পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডলীর তারা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। খালি চোখে সর্বোচ্চ 4.5 মাত্রা, আর ৩২-সেমি টেলিস্কোপে তারার সীমা প্রায় ১৩ মাত্রা।

ক্লাস 9: অভ্যন্তরীণ-শহরের আকাশ

এটি সবচেয়ে আলো-দূষিত আকাশ। শীর্ষস্থানেও আকাশ উজ্জ্বল। অনেক পরিচিত নক্ষত্রপুঞ্জ সম্পূর্ণ অদৃশ্য।Pleiades ছাড়া প্রায় কোনো মেসিয়ার বস্তু খালি চোখে দেখা যায় না। চাঁদ, গ্রহ এবং কয়েকটি উজ্জ্বল তারকা ক্লাস্টারই এখানে পর্যবেক্ষণের মূল আনন্দ। খালি চোখের সীমা 4.0 বা তার কম।

গভীর-আকাশ পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি

আমাদের রাতের আকাশ অসংখ্য নীহারিকা, গ্যালাক্সি, ও তারকা ক্লাস্টারে ভরা। আকাশের শ্রেণি বুঝতে পারলে আপনি সহজেই জানতে পারবেন কোন বস্তু আপনার অবস্থান থেকে দেখা সম্ভব। জ্যোতির্বিদ্যায় নতুন হলে এই শ্রেণিবিভাগ আপনাকে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করতে এবং সঠিক প্রত্যাশা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। 

আপনি কোন বোর্টল ক্লাসে আছেন তা বুঝবেন কীভাবে?

কিছু সহজ প্রশ্ন নিজেকে করুন—

  • মিল্কিওয়ে কি খালি চোখে দেখা যায়?
  • আকাশের মেঘ কি অন্ধকার নাকি উজ্জ্বল দেখায়?
  • সবচেয়ে ক্ষীণ কোন মাত্রার তারা আপনি খালি চোখে দেখতে পান?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলিয়ে দেখলেই আপনার আকাশের বোর্টল ক্লাস সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

বোর্টল স্কেল ও টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ

একই টেলিস্কোপে ভিন্ন বোর্টল ক্লাসে ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। ক্লাস ২ আকাশে যে গ্যালাক্সি স্পষ্ট দেখা যায়, ক্লাস ৭ আকাশে সেটি প্রায় অদৃশ্য হতে পারে। তাই নতুন টেলিস্কোপ কেনার আগে বা পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনার সময় নিজের আকাশের বোর্টল ক্লাস জানা অত্যন্ত জরুরি।

আলো দূষণ কমানো কেন প্রয়োজন?

বোর্টল স্কেলের নিচের দিকের ক্লাসগুলো বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে রাতের আকাশ থেকে আমরা অনেক সৌন্দর্য হারাব। সঠিক আলো ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং সচেতনতা বাড়ালে আমরা আবার অন্ধকার আকাশ ফিরে পেতে পারি।

শেষ কথা

বোর্টল স্কেল হলো রাতের আকাশ বোঝার একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী উপায়। আপনি নতুন স্টারগেজার হোন বা অভিজ্ঞ জ্যোতির্বিদ, এই স্কেল জানলে আপনার পর্যবেক্ষণ আরও অর্থবহ হবে। আকাশ যত অন্ধকার, মহাবিশ্ব তত বেশি উন্মুক্ত।


Clear sky & happy observation!



নিবন্ধ: এফ. রহমান

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

Explore the Universe With Us

Be a part of Bangladesh's growing astronomy community. Join workshops, observe the night sky, and discover the wonders of the cosmos together.

Join Us