May 20, 2026 • 0 views
আমরা চোখে যা দেখি, মহাবিশ্ব তার চেয়েও অনেক বড়। তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের অসংখ্য রূপ রয়েছে, যার বেশিরভাগই আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। তবে সেগুলো অদৃশ্য হলেও অকার্যকর নয়। ইনফ্রারেড আলো আমাদের উষ্ণতা দেয়, অতিবেগুনী আলো রোদে পোড়া এবং ত্বকের ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করি যোগাযোগের জন্য, আর এক্স-রে কাজে লাগে শরীরের ভেতরের ভাঙা হাড় দেখার জন্য। এই সব বিকিরণই মহাবিশ্বের ভেতর দিয়ে তথ্য বহন করে ভ্রমণ করছে। কিন্তু সেগুলো “দেখতে” হলে আমাদের বিশেষ যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয়। সেই যন্ত্রগুলো বিকিরণ সনাক্ত করে এবং তার ভেতরে থাকা তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে আমরা তা বুঝতে পারি।
| রেডিও পর্যবেক্ষণাগার |

রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিশাল আকারের টেলিস্কোপ নির্মাণ করেছেন। একক ডিশের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ হলো FAST (পাঁচশো মিটার অ্যাপারচার গোলাকার টেলিস্কোপ), যা চীনে অবস্থিত। এটি পাহাড়ি ভূখণ্ডকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে এবং ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করে।
রেডিও তরঙ্গ সংগ্রহ করার জন্য ব্যবহৃত সেন্সরগুলো প্রধান ফোকাসে স্থাপন করা হয়েছে এবং তারের সাহায্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়। যেহেতু এই টেলিস্কোপ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে ঘোরানো যায় না, তাই সেন্সরগুলো তার বরাবর সামান্য নড়াচড়া করে ভিন্ন ভিন্ন দিকে নির্দেশ করা হয়। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম চালনাযোগ্য রেডিও টেলিস্কোপ হলো Green Bank Observatory, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রিন ব্যাঙ্কে অবস্থিত। এর ডিশের প্রস্থ ৩০০ ফুটেরও বেশি এবং মোট উচ্চতা প্রায় ৪৫০ ফুটের কাছাকাছি। রিসিভারটি প্রধান ফোকাসে থাকলেও পুরো কাঠামো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে মূল ফোকাসটি পাশের দিকে বা “অফ-অ্যাক্সিস” অবস্থানে থাকে। ফলে আগত রেডিও তরঙ্গের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না এবং তথ্য সংগ্রহ আরও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়।
| ইনফ্রারেড পর্যবেক্ষণাগার |

Spitzer Space Telescope
ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনী টেলিস্কোপের নকশা অনেকটাই দৃশ্যমান আলোর টেলিস্কোপের মতো। পার্থক্যটা মূলত ডিটেক্টরে। এগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শনাক্ত করা যায়। তবে একটি বড় সমস্যা আছে। ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনী আলোর বেশিরভাগ অংশই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সহজে পৌঁছাতে পারে না। ফলে স্থলভিত্তিক টেলিস্কোপ দিয়ে এই আলো পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
প্রথম বড় ইনফ্রারেড মহাকাশ টেলিস্কোপ ছিল Spitzer Space Telescope। এটি ২০০৩ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়। পৃথিবীর নিজস্ব ইনফ্রারেড বিকিরণ থেকে দূরে থাকার জন্য এটিকে এমন কক্ষপথে রাখা হয়েছিল, যাতে পৃথিবীর তাপীয় প্রভাব তার পর্যবেক্ষণে বাধা সৃষ্টি না করে। এই বিশেষ অবস্থান স্পিটজারকে মহাবিশ্বের ঠান্ডা ও ধূলিময় অঞ্চলগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে সাহায্য করেছে।

এরপর আসে আরও উন্নত প্রযুক্তির James Webb Space Telescope। এটি ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই টেলিস্কোপ মধ্য-ইনফ্রারেড অঞ্চলের কাছাকাছি আলো পর্যবেক্ষণ করে। এর বিশাল আয়নায় সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যাতে ইনফ্রারেড আলো আরও দক্ষতার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়।

James Webb Telescope Orbit
সংবেদনশীলতা বাড়ানোর জন্য জেমস ওয়েবকে পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার L2 ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টের কাছাকাছি কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। এই অবস্থান টেলিস্কোপকে স্থিতিশীল তাপমাত্রায় রেখে গভীর মহাকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়।
| অতিবেগুনী পর্যবেক্ষণাগার |
GALEX Telescope
অতিবেগুনী আলো দিয়ে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য ১৯৬৮ সালে Orbiting Astronomical Observatory 2 উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি ছিল মহাকাশ থেকে অতিবেগুনী আলো নিয়ে কাজ করার প্রথম দিকের প্রচেষ্টা। যদিও আলাদা করে অতিবেগুনী আলো নিয়ে কাজ করার জন্য বড় কোনো স্পেস অবজারভেটরি দীর্ঘদিন ছিল না, তবুও Hubble Space Telescope-এর ওপর এমন একটি যন্ত্র রয়েছে যা অতিবেগুনী রঙে ছবি তুলতে সক্ষম। এছাড়া ২০০৩ সালে উৎক্ষেপিত Galaxy Evolution Explorer বা গ্যালেক্স বিশেষভাবে অতিবেগুনী আলো ব্যবহার করে গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছে। এই পর্যবেক্ষণাগারগুলো আমাদের দেখিয়েছে, দৃশ্যমান আলোর বাইরে লুকিয়ে থাকা মহাবিশ্ব কতটা সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়।
| এক্স-রে পর্যবেক্ষণাগার |
Chandra Telescope
মহাকাশে এক্স-রে উৎস খুঁজে বের করার প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭০ সালে, যখন Uhuru নামের প্রথম এক্স-রে অবজারভেটরি উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি মহাবিশ্বে শক্তিশালী এক্স-রে বিকিরণের উৎস শনাক্ত করার পথ খুলে দেয়। এরপর ১৯৯৯ সালে উৎক্ষেপণ করা হয় Chandra X-ray Observatory, যা গ্রেট স্পেস অবজারভেটরি গুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চন্দ্র আজও মহাকাশের ব্ল্যাক হোল, নিউট্রন তারকা ও সুপারনোভার মতো চরম শক্তিশালী বস্তু নিয়ে গবেষণা করছে। এক্স-রে টেলিস্কোপের নকশা সাধারণ টেলিস্কোপের মতো নয়। দৃশ্যমান আলোর টেলিস্কোপে প্যারাবলিক আয়না বা ডিশ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এক্স-রে ফোটন এত শক্তিশালী যে সেগুলো সরাসরি আয়নায় পড়লে ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারে।

Chandra Telescope Structure
তাই এক্স-রে টেলিস্কোপে নেস্টেড বা একটির ভেতরে আরেকটি বসানো কনসেন্ট্রিক রিং ব্যবহার করা হয়। এই বিশেষ বিন্যাস শক্তিশালী এক্স-রে ফোটনকে ধীরে ধীরে প্রতিফলিত করে একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করে।
| গামা রে পর্যবেক্ষণাগার |
Compton Gamma Ray Observatory
গামা রশ্মি তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। এদের ফোটন এত বেশি শক্তিধর যে প্রচলিত অর্থে এগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব নয়। তাই প্রচলিত ধরনের গামা রে টেলিস্কোপ তৈরি করা যায় না। ১৯৭২ সালে গামা রশ্মি নিয়ে গবেষণার জন্য Small Astronomy Satellite 2 উৎক্ষেপণ করা হয়। পরে ১৯৯১ সালে গ্রেট স্পেস অবজারভেটরিগুলোর অংশ হিসেবে চালু হয় Compton Gamma Ray Observatory। কম্পটন অবজারভেটরি ২০০০ সাল পর্যন্ত কাজ করেছে। এর অন্যতম বড় সাফল্য ছিল গামা রশ্মির ফ্রিকোয়েন্সিতে সমগ্র আকাশের একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ সম্পন্ন করা। এই পর্যবেক্ষণ আমাদের দেখিয়েছে, মহাবিশ্বে বিস্ফোরণধর্মী ও চরম শক্তিশালী ঘটনাগুলো কতটা সক্রিয়।
সব মিলিয়ে পুরো চিত্র
রেডিও থেকে শুরু করে গামা রশ্মি পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করা দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো আকাশের সমগ্র অংশের সমীক্ষা করেছে। প্রতিটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য আমাদের ভিন্ন ধরনের তথ্য দেয়। কোথাও ঠান্ডা গ্যাসের উপস্থিতি, কোথাও উচ্চ তাপমাত্রার বিস্ফোরণ, কোথাও অদৃশ্য ব্ল্যাক হোলের ইঙ্গিত।
এই সব তথ্য একসঙ্গে মিলিয়েই আমরা মহাবিশ্বের একটি আরও সম্পূর্ণ ও গভীর চিত্র পাই। দৃশ্যমান আলোর সীমা ছাড়িয়ে যখন সব ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য যুক্ত হয়, তখনই অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয়।
Radio All Sky Survey (PLANCK) Ultraviolet All Sky Survey (GALEX)


Infrared All Sky Survey (WISE) X-Ray All Sky Survey (ROSAT)


Visible Light All Sky Image Gamma Ray All Sky Survey (EGRET)


Be a part of Bangladesh growing astronomy community. Join workshops, observe the night sky, and discover the wonders of the cosmos together.
Join Us →