মেসিয়ার ম্যারাথন কী? এক রাতেই ১১০টি গভীর আকাশের বস্তুর সন্ধানে |
শীতের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর গোলার্ধে আকাশপ্রেমীদের জন্য শুরু হয় বিশেষ আনন্দের সময়। বসন্ত মানেই নতুন নক্ষত্রমণ্ডল, নতুন গ্যালাক্সি ও নীহারিকার আবির্ভাব। আর এই সময়েই আকাশ পর্যবেক্ষকদের জন্য আসে বছরের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, মেসিয়ার ম্যারাথন।
এই গাইডে আপনি জানবেন মেসিয়ার ম্যারাথন কী, এর ইতিহাস, মেসিয়ার ক্যাটালগ, কখন ও কীভাবে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে হয় এবং সফল হওয়ার বাস্তবসম্মত কৌশল।
| মেসিয়ার ম্যারাথন কী? |
মেসিয়ার ম্যারাথন হলো একটি সারা রাতব্যাপী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ চ্যালেঞ্জ। এতে এক রাতেই যতটা সম্ভব, আদর্শভাবে সব (১১০টি) মেসিয়ার অবজেক্ট শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
১৯৭০-এর দশকে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী টম হোলফেল্ডার, ডোনাল্ড মাখোলজ ও টম রেইল্যান্ড প্রথম “মেসিয়ার ম্যারাথন” ধারণাটি চালু করেন। এটি মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত একটি সারা রাতব্যাপী পর্যবেক্ষণ চ্যালেঞ্জ। এই সময় সূর্য মীন ও কুম্ভ রাশির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, যেখানে কোনো মেসিয়ার বস্তু নেই। ফলে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যে তাত্ত্বিকভাবে সব ১১০টি মেসিয়ার অবজেক্ট পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
সাধারণত ২০° দক্ষিণ থেকে ৫৫° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান করা পর্যবেক্ষকদের জন্য এই ম্যারাথন সবচেয়ে উপযোগী।
| চার্লস মেসিয়ার কে ছিলেন? |
মেসিয়ার ম্যারাথনের বিস্তারিত আলোচনার আগে, সেই ব্যক্তির কথা জানা জরুরি যার নামানুসারেই এই চ্যালেঞ্জের নামকরণ। চার্লস মেসিয়ার ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও খ্যাতনামা ধূমকেতু শিকারী। তিনি অন্তত তেরোটি ধূমকেতু আবিষ্কার করেন এবং আরও বেশ কয়েকটির সহ-আবিষ্কারক ছিলেন।
১৭৫৮ সালের এক গ্রীষ্মের রাতে ধূমকেতু অনুসন্ধানের সময় তিনি বৃষ রাশির দক্ষিণ শিংয়ের কাছে একটি ছোট, ধোঁয়াটে বস্তু লক্ষ্য করেন। প্রথমে সেটিকে হ্যালির ধূমকেতু মনে হলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন, এটি একটি স্থির বস্তু। এটিই তার জার্নালের প্রথম এন্ট্রি হয়ে ওঠে, যা পরিচিত হয় মেসিয়ার ১ (M1) নামে। আজ আমরা এই বস্তুটিকে ক্র্যাব নেবুলা নামে চিনি, যা ১০৫৪ সালে চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম লক্ষ্য করেছিলেন।
ধূমকেতুর সঙ্গে বিভ্রান্তি এড়াতে মেসিয়ার এই ধরনের স্থির ও অস্পষ্ট বস্তুগুলোর নিয়মিত নথি রাখতে শুরু করেন। এর ফলেই জন্ম নেয় বিখ্যাত মেসিয়ার ক্যাটালগ।
| মেসিয়ার ক্যাটালগ কী? |
আজ সারা বিশ্বের অসংখ্য অপেশাদার ও পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী চার্লস মেসিয়ারের এই জার্নালকে অনুসরণ করেন, যা মেসিয়ার ক্যাটালগ নামে পরিচিত। যদিও এতে সব জনপ্রিয় মহাজাগতিক বস্তু নেই, তবুও উত্তর গোলার্ধ থেকে দেখা যায় এমন অনেক উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তু এতে অন্তর্ভুক্ত, কারণ মেসিয়ার প্যারিস থেকে তার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
মেসিয়ার ক্যাটালগে মোট ১১০টি গভীর আকাশের বস্তু রয়েছে, যেগুলোকে M1 থেকে M110 পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে:
জনপ্রিয় কিছু বস্তু হলো গ্রেট ওরিয়ন নেবুলা (M42), অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি (M31/M32), হারকিউলিস গ্লোবুলার ক্লাস্টার (M13) এবং রিং নেবুলা (M57)।
জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, মেসিয়ার নিজে ক্যাটালগের সব বস্তু আবিষ্কার করেননি। তিনি ছোট টেলিস্কোপ ব্যবহার করে সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রায় ৪০টির বেশি বস্তু শনাক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নতুন বস্তু যুক্ত করেন। সর্বশেষ সংযোজন M110, যা ১৯৬৭ সালে ক্যাটালগে অন্তর্ভুক্ত হয়।
| কখন ও কোথায় মেসিয়ার ম্যারাথন করা যায়? |
সাধারণত ২০° দক্ষিণ থেকে ৫৫° উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থান করলে সেরা ফল পাওয়া যায়। নিম্ন অক্ষাংশে থাকা পর্যবেক্ষকরা কিছু বস্তু তুলনামূলক সহজে দেখতে পান।
মেসিয়ার ম্যারাথনের সেরা সময় হলো অমাবস্যার কাছাকাছি রাত। এই সময় চাঁদের আলো না থাকায় ক্ষীণ বস্তুগুলো দেখা সহজ হয়। সাধারণত ম্যারাথন শুরু হয় সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে নিচু অবস্থানে থাকা M77 ও M74 গ্যালাক্সি দিয়ে। এরপর পর্যবেক্ষকরা তালিকার পরবর্তী বস্তুগুলোর দিকে অগ্রসর হন এবং ভোর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান। কিছু নক্ষত্রমণ্ডলে মেসিয়ার বস্তুর সংখ্যা বেশি। ধনু রাশিতে রয়েছে ১৫টি, যা সর্বাধিক। কন্যা রাশিতে ১১টি, কোমা বেরেনিসেসে ৮টি, ওফিউকাস ও উরসা মেজরে ৭টি করে এবং ক্যানেস ভেনাটিসি ও লিওতে রয়েছে ৫টি করে বস্তু।
সূর্যোদয়ের ঠিক আগে পূর্ব দিগন্তে শেষ লক্ষ্য হিসেবে সাধারণত গ্লোবুলার ক্লাস্টার M30 দেখা হয়। তখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, কারণ ভোরের আলো দ্রুত আকাশ ঢেকে ফেলে।
| মেসিয়ার ম্যারাথনের জন্য সহায়ক টিপস |
সবাই এক রাতেই সব ১১০টি বস্তু দেখতে পারবেন না। চাইলে এই ম্যারাথনকে কয়েকটি রাতে ভাগ করেও সম্পন্ন করা যায়।
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট
Be a part of Bangladesh's growing astronomy community. Join workshops, observe the night sky, and discover the wonders of the cosmos together.
Join Us →